ajkervabna.com
সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

জেনে নিন ঢাকা-১৮ আসনে জাহাঙ্গীরের বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পেছনের খবর

অনলাইন ডেস্ক | ১১ নভেম্বর ২০২০ | ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ | 28 বার

জেনে নিন ঢাকা-১৮ আসনে জাহাঙ্গীরের বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পেছনের খবর

ঢাকা-৫ ও ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা ঘটনা ও কিছুটা মেরুকরণের খবর পাওয়া গেছে। দলের কেউ কেউ ওই ঘটনাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ভারসাম্যমূলক নীতি’ বলেও মনে করছেন। আবার কারো মতে, মনোনয়নের ঘটনায় দলের একটি অংশ বেজায় অসন্তুষ্ট হয়েছে। কারণ ঢাকা-৫ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন তাদের তৎপরতায় হলেও ঢাকা-১৮ আসনের মনোনয়ন তাদের মনঃপূত হয়নি।

গত ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচন। অন্যদিকে আগামী ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচন।

জানা গেছে, ঢাকা-৫ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন ও ভোটের ফলের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা-১৮ আসনের মনোনয়নে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সূত্র জানাচ্ছে, তারেকের অনাগ্রহ সত্ত্বেও ঢাকা-৫ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আহম্মেদকে, যিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। অন্যদিকে দলের ওই অংশেরই আপত্তি সত্ত্বেও ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যুবদল উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে গয়েশ্বরের বৈরী সম্পর্কের বিষয়টি বিএনপিতে সর্বজনবিদিত। তারেকের অমতে সালাহ উদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে বলে বিএনপির মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। কারণ মাত্র দুই হাজার ৯২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচন বর্জন করার ঘটনাটি তারেকসহ দলের হাইকমান্ড ভালোভাবে নেননি। তাঁদের মতে, মনোনয়নের জন্য যতটা জোর লড়াই সালাহউদ্দিন করেছেন, নির্বাচনে জেতার জন্য ততটা লড়াই তিনি করেননি।

অবশ্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, জয়লাভের জন্য তিনি সর্বতোভাবে চেষ্টা করলেও সরকারি দল সব কিছু দখল করে ভোট ছিনিয়ে নিয়েছে। তা ছাড়া নবীউল্লাহ নবীসহ স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী অনেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো, মনোনয়নের ব্যাপারে যাঁরা আমার পক্ষে ছিলেন তাঁরাও অসুস্থতার কথা বলে আমার পক্ষে মাঠে নামেননি।’

জানা গেছে, ভবিষ্যতে ছেলে তানভীর আহমেদ রবিনকে নির্বাচনী মাঠে আনার চিন্তা থেকেই নিজের আসন বাদ দিয়ে ঢাকা-৫ আসনে মনোনয়ন পেতে তৎপর হন সালাহউদ্দিন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তাঁকে ঢাকা-৪ ও নবী উল্লাহ নবীকে ঢাকা-৫ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থে গত ১৭ অক্টোবরের উপনির্বাচনে নবীকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে বিএনপির কেউ কেউ মনে করছেন।

সালাহউদ্দিনের আসন পরিবর্তনের ঘটনায় দলের মধ্যে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আগামী নির্বাচনে সালাহউদ্দিন ও নবীর মনোনয়নের বিষয়টি কিভাবে মীমাংসা হবে। কারণ এরই মধ্যে ঢাকা-৪ আসনের স্থানীয় দুই নেতা কাউন্সিলর মীর হোসেন মীরু ও আ ন ম সাইফুল আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন—এমন কথা দলের মধ্যে বলে বেড়াচ্ছেন। ‘কৌশলগত কারণে’ তাঁরা দুজন ঢাকা-৫ আসনে সালাহউদ্দিনের মনোনয়নের পক্ষে ছিলেন। কারণ তাঁরা চেয়েছেন, সালাউদ্দিন ঢাকা-৪ ছেড়ে চলে গেলে ভবিষ্যতে তাঁরাই ওই আসনে মনোনয়ন চাইতে পারবেন। কিন্তু ছেলে রবিনের ভবিষ্যৎ চিন্তার পাশাপাশি খোকা সমর্থক নবী উল্লাহ নবীকে হটাতে সালাহউদ্দিন দখলে নিয়েছেন ঢাকা-৫ আসনটি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘রবিন নির্বাচন করলে ঢাকা-৪ থেকে করবে।’

তবে নবী উল্লাহ নবী প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, ‘বিএনপি কি সালাহউদ্দিনের বাপ-দাদার সম্পত্তি নাকি?’ মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এই সহসভাপতি বলেন, ‘আমি রাজনীতির নোংরা খেলার শিকার হয়েছি, জবাই হয়েছি। তাই বলে সালাহউদ্দিনের মতো বেঈমান লোকের সঙ্গে আপসের কিছু নেই। ঢাকা-৫ আসনের জনগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’

জানা গেছে, তারেক রহমানেরও পছন্দের প্রার্থী ছিলেন নবী উল্লাহ নবী। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকারও তিনি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ফলে বিএনপির ভেতরে আলোচনা হলো—ঢাকা মহানগর বিএনপিতে মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার মধ্যকার নেতৃত্বের পুরনো লড়াই ও দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছেন নবী। অবশ্য ওই সময় করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় নবী এবার মনোনয়নের জন্য তদবির করতে পারেননি। আবার জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও অনেক কম। কারামুক্ত খালেদা জিয়ার কিছুটা সমর্থনও পান সালাহউদ্দিন। ফলে আব্বাস-গয়েশ্বরের আগ্রহের বিপরীতে দলের স্থায়ী কমিটির অন্য নেতারা তেমন একটা আপত্তি না করায় শেষ পর্যস্ত মনোনয়ন পেয়ে যান সালাহউদ্দিন।

কিন্তু মনোনয়ন পেতে মরিয়া সালাহউদ্দিনের নির্বাচনে যে ভূমিকা দৃশ্যমান হয়েছে তাতে দলটির হাইকমান্ড সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলে জানা যায়। সূত্র মতে, ওই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে তৎপর হয়েছেন তারেক রহমান। পাশাপাশি দলের বড় একটি অংশও ভারসাম্য আনার জন্য গয়েশ্বরবিরোধীদের সামনে আনার পরামর্শ দিয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত কারো মতামতের তোয়াক্কা না করে এবং নিজের নেতৃত্বের কথা চিন্তা করেই জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন দেন তারেক। শুধু তাই নয়, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কও তিনি করেছেন গয়েশ্বরবিরোধী বলে পরিচিত আমানউল্লাহ আমানকে। কেরানীগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে আমান ও গয়েশ্বরের সম্পর্ক চির বৈরী বলে বিএনপির সর্বস্তরে আলোচনা আছে। যদিও ভাবমূর্তির সংকটে থাকা আমান দীর্ঘদিন দলে কোণঠাসা ছিলেন। অনেকের মতে, তাঁকে শুধু গয়েশ্বরের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো হচ্ছে।

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হলেও যুবদল ঢাকা উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীরের সঙ্গেও বৈরী সম্পর্ক রয়েছে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের। সে কারণেই মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম কফিল উদ্দিন আহম্মেদের পক্ষে ছিলেন তিনি। অবশ্য উত্তরায় কফিলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

কফিল উদ্দিন আবার দলের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মেজর (অব.) কামরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ লোক বলে পরিচিত। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যেও কেউ কেউ কফিলের পক্ষে ছিলেন। কামরুলের ছেলের মালিকানাধীন গুলশানের ‘ফিরোজায়’ ভাড়া থাকছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেই ভাড়ার বিষয়টি নিয়েও কামরুলের সঙ্গে বিএনপির বর্তমানে গোলমাল চলছে। ফলে কফিলকে মনোনয়ন দিয়ে কিছুটা হলেও কামরুলকে ‘শান্ত’ করার পক্ষপাতী ছিলেন অনেকে। কিন্তু ঢাকা-৫-এর মনোনয়ন ও নির্বাচনী ফলাফলের ঘটনা সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।

দুটি আসনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কারণ স্থায়ী কমিটিতে যথাযথ মূল্যায়ন করেই তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’

আমানকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে বলে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গয়েশ্বর বলেন, ‘দায়িত্ব দিলে সমস্যা কি! কত দিন আর বসে বসে খাবে। তবু একটা কাজে থাকুক।’

২০১৬ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের দুই দিন আগে যুবদল নেতা সাইফুল আলম নীরব এবং তাঁর অনুসারী বলে পরিচিত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে গয়েশ্বরের বচসা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সেই থেকে তাঁরা পরস্পরের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন বলে মনে করা হয়।

জানতে চাইলে এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘কেন্দ্রের মেরুকরণ আমি আসলে বুঝতে চাই না। কারণ আমি একজন মাঠকর্মী। তবে আমি এটুকু বলব, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং স্থায়ী কমিটির সবাই মিলে আমাকে মনোনয়ন দেওয়ার ফলে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন।’

জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন দেওয়ার পরে বিএনপি মহাসচিবের উত্তরার বাসায় হামলার ঘটনাও কফিলের বিরুদ্ধে এবং জাহাঙ্গীরের পক্ষে গেছে। কেউ কেউ ওই ঘটনায় জাহাঙ্গীরবিরোধীদের ইন্ধন থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন।

তবে জানতে চাইলে কফিল উদ্দিন বলেন, ‘ওই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে আমি যুক্ত নই।’ তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ জানি না। দল যা ভালো মনে করেছে তাই করেছে। আমি দলের পক্ষে আছি।’

সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবদুস সালাম বলেন, ‘মনোনয়ন বা যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তা ছাড়া বিএনপির মতো বড় দলের নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা থাকাই স্বাভাবিক।’ ‘তা ছাড়া কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সবদিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন’, বলেন ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এই সমন্বয়ক।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১১ নভেম্বর ২০২০

ajkervabna.com |

advertisement
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
advertisement
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
advertisement

©- 2021 ajkervabna.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।