ajkervabna.com
সোমবার ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ডাক্তার মঈনের মৃত্যু থেকে শিক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৮ অক্টোবর ২০২০ | ১২:৫৫ অপরাহ্ণ | 404 বার

ডাক্তার মঈনের মৃত্যু থেকে শিক্ষা

ডাক্তার মঈনের মৃত্যু সারাদেশকে বিক্ষুব্ধ করেছে। কারণ তিনি মানবতার সেবা করতে গিয়ে নিদারুণ অবহেলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যু সারাদেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশের করোনা লড়াইয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন ডাক্তার মঈন। তিনি করোনা যুদ্ধে আমাদের প্রথম শহীদ, জাতীয় বীর। আল্লাহ তার বিদেহি আত্মাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।

করোনা নিয়ে যখন সারা দুনিয়ায় তোলপাড়, সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলা করতে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছিল অন্যরা, তখন আমাদের দেশ আনন্দের বন্যায় ভাসছিল। দায়িত্ববানদের মুখে ছিল অহঙ্কারের বুলি, আর মিথ্যাচারের অর্কেস্ট্রা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ নানা দেশ থেকে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছিল। বিরল নজির হিসেবে চীনা রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে বাংলাদেশে স্থল ও বিমানপথে গমনাগমন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য স্ট্ক্রিনিং, কোয়ারেন্টাইন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। গণমাধ্যম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, নেটিজেনরা অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের দাবি জানাচ্ছিলেন। এসবের অভাব ও সংগ্রহ বিতরণে সরকারের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করে তারা কর্তাদের বিরাগভাজন হয়েছেন। এমন কি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তারা অপ্রত্যাশিত নিন্দার শিকার হয়েছেন। কিন্তু একটি কথা কেউ বিবেচনা করেননি, যে বিনা প্রস্তুতিতে যুদ্ধে যাওয়া যায় না। তাতে লাভ হয় না কিছুই; ক্ষতি হয় সবটুকুই।

আমরা প্রায়ই বলে থাকি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ খুবই দক্ষ। এ কথা আংশিক সত্য। দৈব-দুর্বিপাকের এ দেশে দুর্যোগ লেগেই থাকে। সে জন্য এখানে একটি বিশাল বাহিনী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে সব দুর্যোগে গোটা দেশ অবরুদ্ধ করার দরকার পড়েনি। গোটা দেশকে ঘরবন্দি থাকতে হয়নি। মানুষে মানুষে দূরত্ব বজায় রাখতে হয়নি। এমন ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভার এ দেশে ঘটেছিল প্রায় একশ’ বছর আগে, ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু ছড়িয়েছিল এ দেশে। কিন্তু তখন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি। কলেরা, গুটি বসন্তের সংক্রমণও অনেকটা সীমাবদ্ধ কিছু এলাকায়। গোটা দুনিয়াকে একসঙ্গে তটস্থ করে তোলেনি। কিন্তু গ্লোবাল ভিলেজের এ যুগে সমগ্র বিশ্বই একটা গ্রাম। আর তাই করোনা ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে, দুনিয়াজুড়ে একসঙ্গে। ভয়ের কারণ এই গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন।

মনে রাখতে হবে, নগদ টাকা প্রদানের চেয়ে কাজ দেওয়ার ফল অনেক বেশি কার্যকর। নগদ টাকায় সাহায্য দুর্নীতি বাড়ায়, চুরি বাড়ায়। মুদ্রাস্টম্ফীতি ঘটায়। মজুদদারি বাড়ায়। জিনিসের দাম বেড়ে তা সাধারণ মানুষের কেনার সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। মনুষ্যত্বের অবমাননা ঘটায়। নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে। দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণায় বিশ্বখ্যাত বাঙালি কল্যাণ অর্থনীতিবিদ নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন তাই পরামর্শ দেন, মানুষকে শহরে সমাবেশ না ঘটিয়ে গ্রামেই নানা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি সচল রাখতে পারলেই কেবল দুর্ভিক্ষ-মহামারি রোধ করা সহজ হয়।

তাই আমি মনে করি, এখনই পরিকল্পনা করা হোক। সে পরিকল্পনা আমলা দিয়ে সম্ভব নয়। এখন দরকার বিশেষজ্ঞ। দলমতনির্বিশেষে দেশের সেরা বিশেষজ্ঞদের সমাবেশ ঘটিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। সঠিক চিকিৎসার জন্য যেমন দরকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্যও দরকার বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ। তবে চামচা বিশেষজ্ঞ শুধুই ভুল পথে নিয়ে যাবে। দরকার সাহসী, স্বাধীন, নিঃস্বার্থ বিশেষজ্ঞ দল। আমাদের অবশ্যই আমলা নির্ভরতা কমাতে হবে।

গত পরশু কিছু জরুরি ওষুধ আর সওদা কিনতে বেরোতে হয়েছিল আমাকে। নিরন্ন মানুষের মুখের দিকে তাকানো যায় না। তাদের শরীর ক্ষীণ হয়ে গেছে। অনাহারের ছবি স্পষ্ট। শুনতে পাচ্ছি, সবার জন্য নাকি সাহায্যের বড় বড় প্যাকেজ চালু হয়েছে। নিশ্চয়ই হয়েছে। একেবারে অস্বীকার করার কারণ নেই। কিন্তু এই ঢাকা শহরে এত ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় কেন? তারা কেন প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে না? গ্রাম থেকেও একই ধরনের মর্মস্পর্শী খবর পাচ্ছি। সমন্বিত ব্যবস্থাপনা থাকলে তো এমন হওয়ার কথা নয়! এখন গরমের সময়। তাই করোনা ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা শীতের সময়ের তুলনায় কিছুটা হলেও সহজ। মানুষজন ঘরবন্দি। অন্তত ৮০ ভাগ মানুষ সত্যিই ঘরে বন্দি হয়ে আছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ। হোটেলগুলো খালি। কমিউনিটি সেন্টারগুলো ফাঁকা। এমন অনেক ফাঁকা অবকাঠামো ইচ্ছা করলেই নানা কাজে ব্যবহার করা যায়। সেখানে অস্থায়ী খাদ্যভাণ্ডার, চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা যায়। কোথাও ভাসমান-বস্তির মানুষকে এনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা যায়। সেখানে তাদের নিয়মিত খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা সহজে দেওয়া সম্ভব। সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার নূ্যনতম ব্যবস্থা করা দরকার। গরিব মানুষের জন্য মাস্ক, স্যানিটাইজার, সাবানসহ কিছু জরুরি সামগ্রী দিতে হবে।

আবার এদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে অনেক জরুরি কাজ করানো সম্ভব। অনেককে রাস্তা, শহর, নগর পরিস্কার রাখার কাজে লাগানো যায়। তার মানে এই নয় যে, তারা পচা, ময়লা-আবর্জনা, নর্দমা সাফাই করবে। এর বাইরেও অনেক ধরনের কাজ আছে, যেগুলো করা এখন জরুরি। এমন অনেক কাজেই গরিব যুবকদের ব্যবহার করা সম্ভব। তারা কাজ চান। শুধু পরিকল্পনা করে, মোটিভেশন করে এই মহাযজ্ঞে বিপুল সংখ্যক মানুষকে কাজে লাগানো যায়। বিনিময়ে তাদের মজুরি দিতে হবে। সে মজুরি হবে পরিবারের চাহিদার ভিত্তিতে। অনেকটা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো। ‘সাধ্যমতো কাজ, দরকার মতো মজুরি।’ সেটা নির্ভর করবে পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের সংখ্যার ওপর। জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সহজে এ তালিকা তৈরি করা যায়।

কলকারখানা বন্ধ। মানুষের কাজ নেই। কবে কারখানার চাকা ঘুরবে কেউ জানে না। তাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করা। সেখানে এখন কাজের সুযোগ আছে। ফসল ওঠার মৌসুম শুরু হচ্ছে। ফসল তোলার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। বুঝতে হবে, এই ফসলই এ দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র পথ। গ্রামীণ মানুষকে ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো, পরিবহন নানা ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করতে পারে। রিলিফ না দিয়ে সরকার তাদের হাতে তুলে দেবেন মজুরি। এর ফলে অনেক সুফল পাওয়া যাবে। মানুষ কাজ পাবে। কৃষকের ফসল ঘরে উঠবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। সরকার ইচ্ছা করলে ভালো করে শুকিয়ে উদ্বৃত্ত ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনে নিতে পারবে। তাতে সরকারি গুদামে প্রচুর ধান জমা পড়বে। সরকার আপৎকালীন খাদ্য মজুদ করতে পারবে এবং আগামী বছর সম্ভাব্য খাদ্য সংকট সহজে মোকাবিলা করতে পারবে। এভাবে টাউট, মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে বাফার স্টক গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে বিশ্ব বাজারে খাদ্যশস্যের আকাল আসন্ন। তাই নিজস্ব উৎপাদন দিয়েই সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এবারের দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী। তাই ইচ্ছা করলেও অনেক দেশই সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারবে না। তাই নিজেদেরই সামর্থ্য বাড়াতে হবে। একটি দানাও অপচয় করা যাবে না। প্রতিটি দানাশস্য ঘরে তুলতে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে সরকারকেই।

বিপুল সংখ্যক কর্মহীন হয়ে মানুষকে গ্রামীণ ফসল তোলা, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার কাজে লাগানো হোক। এ কর্মযজ্ঞে শামিল করা হোক সাধারণ শ্রমজীবী, কর্মজীবী, বেকার যুবক, ছাত্র এমন কী, ছুটি ভোগরত সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষকদেরও। তারা কাজ করবেন নিজ নিজ এলাকায়, নিজ নিজ বাড়িতে থেকে। সবার কাজ নিশ্চয়ই একই হবে না। কাজের প্রয়োজনেই কাজের নানা ধরন তৈরি হবে। যিনি যে কাজের উপযুক্ত তাকে দিয়ে সে কাজ করাতে হবে। আর একটি কথা। এই মহাকর্মযজ্ঞে শামিল করতে হবে রাজনৈতিক মত/বিশ্বাস নির্বিশেষে সবাইকে। কাউকে রাজনৈতিক সুবিধা যেমন দেওয়া যাবে না, তেমনি ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে একজনকেও বঞ্চিত করা যাবে না। দলীয়করণ রুখতে হবে শতভাগ। গোটা কার্যক্রম চালাতে হবে শতভাগ রাজনীতিমুক্ত পদ্ধতিতে। আর এসব কাজ তদারকির দায়িত্ব দিতে হবে সেনাবাহিনীকে।

মজুরি (বা সম্মানি যা-ই বলি) দেওয়া হবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশে সর্বত্র বিকাশ, রকেট ইত্যাদি নানা ধরনের মোবাইল পরিসেবা চালু আছে। আর কাজগুলো সমন্বিত করা যাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো অ্যাপ তৈরি করে। এর ফলে দুর্নীতির লাগাম টানা যাবে।

দ্রুত পরিকল্পনা করে এ কর্মযজ্ঞ শুরু করতে পারলে করোনা দুর্যোগ সামাল দেওয়া যাবে এবং এতে সরকারের সুনাম বাড়বে, ব্যয়ের চেয়ে আয় হবে অনেক বেশি। অন্যথায় এক মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে সামনে।

ট্যাগ :
Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:৫৫ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০

ajkervabna.com |

advertisement
advertisement
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
advertisement

©- 2021 ajkervabna.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।