ajkervabna.com
শুক্রবার ১৬ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৩রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা

অ্যাডভোকেট শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ | ০৪ নভেম্বর ২০২০ | ৪:০৭ অপরাহ্ণ | 320 বার

নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা

পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অত্যন্ত লজ্জাকর খবরগুলো। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই যেন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো। শিশু থেকে মাঝবয়সী নারী, স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী- কেউ বাদ যাচ্ছে না নরপশুদের হাত থেকে। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। ধর্ষণের ঘটনায় বাংলাদেশ কি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চায়? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। কারণ প্রতিনিয়ত ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৯ মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন এবং ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। গত ৯ মাসে ১৬১ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে যৌন হয়রানরি কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ৯ পুরুষ নিহত হয়েছেন।
এ সময়কালে দেশে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপসহ নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। তবে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা ও এর ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ৯ মাসে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৩২ জন নারী। এর মধ্যে হত্যার শিকার হন ২৭৯ নারী এবং পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৭৪ নারী। যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ১৬৮ নারী। এর মধ্যে যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭৩ জন। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৬৬ জনকে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৭ জন নারী। এছাড়া স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন ১২ নারী।
এছাড়া এ সময়ের মধ্যে ১১ জন গৃহকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন এবং বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২ জন গৃহকর্মী। আর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২ জন।

সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে নানা কারণকে দায়ী করলেও সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারাকে। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তের গাফিলতি ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিকৃতি, তথ্য-প্রমাণের অভাব, সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে অনীহাসহ নানাবিধ কারণে অধিকাংশ অপরাধী বিচারে খালাস পেয়ে যায়। অথচ প্রকৃত হিসাব পেলে দেখা যাবে, অপমান সইতে না পেরে ধর্ষণের শিকার নারীরা আত্মহত্যা করেছে তার চেয়েও বেশি।

ধর্ষণ এমন এক সমস্যা, যা শুধু নারীদের নয়, দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। অথচ এই সমস্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সীমাহীন উদাসীনতা আমাদের প্রতিনিয়ত পীড়িত করছে। ধর্ষণ মামলার বহু আসামি ধরা পড়ে না। আবার যারা ধরা পড়ে তাদেরও অধিকাংশ জামিনে বেরিয়ে যায় এবং মামলার বাদীকে চাপ দিয়ে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় অধিকাংশ সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়। প্রভাবশালীদের চাপে এবং ঘুষ নেওয়ার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন বিকৃত করা হয় বলেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আবার ধর্ষণের শিকার নারীদের পরিবার আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে পারে না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুততম সময়ে এসব মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হবে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রের সব রকম সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে থাকবেন এটাই যেখানে সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, এই বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সার্বিক অর্থেই আশঙ্কার। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যেখানে নারীরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা অর্জন করছে। এমনকি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী। দেশের দুটো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নারী। অথচ সেই দেশের এই চিত্র! আমরা মনে করি, ব্যাপকভাবে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণপূর্বক এই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে এটা মনে রাখা দরকার, নারী নির্যাতন রোধ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে হয়তো নির্যাতনের হার একদিনেই নেমে আসবে না, কিন্তু এই হার ধীরে ধীরে কমে আসবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

এটা বলা প্রাসঙ্গিক যে, এই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য ব্যাপকভাবে মানসিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে হলে চিহ্নিত সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার বিকল্প নেই। আর তার জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। মানবাধিকার সংস্থার এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার ঊর্ধ্বমুখী। আর এই হার র্র্ঊধ্বমুখী হওয়ার মূল কারণই হলো দারিদ্র্য, যৌতুক, বহুবিবাহ এবং অশিক্ষা। এছাড়া এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকায় অবৈধ বস্তি গড়ে উঠেছে যেখানে উঠতি বয়সী মেয়েদের মা-বাবারা যখন কর্মস্থলে চলে যান, তখন তাদের কিশোরী মেয়েরা অনেকটাই অরক্ষিত থাকে। আর নিম্ন আয়ের বাবা-মা সন্তানদের ফেলে রেখেই যেতে বাধ্য হন জীবিকার প্রয়োজনে। ফলে এটা স্পষ্ট, নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ঘটনার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে, তা র্র্নিমূল করতে আন্তরিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার নারী নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য প্রবণতাকে দমন করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদানে কোনোরকম পিছপা হবে না। আমি চাই, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হোক এবং নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম ও সম্পাদক ও প্রকাশক আজকের ভাবনা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:০৭ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২০

ajkervabna.com |

advertisement
advertisement
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
advertisement

এডিটর ইন চিফ : অ্যাডভোকেট শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ

নির্বাহী সম্পাদক : অ্যাডভোকেট শেখ সাইফুজ্জামান
সহযোগী সম্পাদক : ড. মোহাম্মদ এনামুল হক এনাম
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়
বাড়ি# ১৬৭, রোড# ০৩, লেভেল ৫, মহাখালি ডিওএইচএস, ঢাকা।
ajkervabna.com@gmail.com or info@ssa-bd.com, +880 16 8881 6691

©- 2021 ajkervabna.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।