ajkervabna.com
বৃহস্পতিবার ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি মিলগুলো মুনাফা করলেও বিপুল লোকসানে ডুবে আছে সরকারি সব চিনিকল

অনলাইন ডেস্ক | ১৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ৯:২৫ অপরাহ্ণ | 116 বার

বেসরকারি মিলগুলো মুনাফা করলেও বিপুল লোকসানে ডুবে আছে সরকারি সব চিনিকল

দিন দিন লোকসানে ডুবে যাচ্ছে সরকারি চিনিকলগুলো। মূলত ব্যাপক অনিয়ম, প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া দুর্নীতির কারণেই সরকারের ১৫টি চিনিকলের এমন অবস্থা হয়েছে। গত ৫ বছরে ওসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। ওই ঋণের পুরোটাই খেলাপি। বর্তমানে সরকারি মিলগুরোতে প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচ ৩শ’ টাকার বেশি। আর বাজারে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৪০ টাকা। যদিও বাজারে সরকারি মিলগুলোর চিনির চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু সরবরাহ করা হয় না। বরং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি চিনিকলগুলো উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ রেখে বাজার এক রকম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যে কারণে সরকারি মিলগুলোতে প্রায় ৪৫ হাজার টন চিনি অবিক্রীত পড়ে রয়েছে। অথচ দেশের বেসরকারি সব চিনিকলই মুনাফা গুনছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে সরকারি মালিকানাধীন ১৫টি চিনিকল রয়েছে। সেগুলো হল- জিলবাংলা সুগার মিলস, ঠাকুরগাঁও সুগার, শ্যামপুর সুগার, সেতাবগঞ্জ সুগার, রংপুর সুগার, পঞ্চগড় সুগার, নর্থবেঙ্গল সুগার, নাটোর সুগার মিলস, মোবারকগঞ্জ সুগার, কুষ্টিয়া সুগার, জয়পুরহাট সুগার, ফরিদপুর সুগার মিলস, রাজশাহী সুগার মিলস এবং কেরু অ্যান্ড কোং সুগার মিল। ওসব মিল ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে বাংলাদেশ সুগার মিলস কর্পোরেশন গঠিত হয়। পরে সুগার মিলস কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন দুটি একীভূত করে বিএসএফআইসি গঠিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে কর্পোরেশন ৩ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। তার মধ্যে বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরেই লোকসান ছিল ৯৭০ কোটি টাকা। আর বিভিন্ন ব্যাংকে ৭ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ রয়েছে। তাছাড়া শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও গ্র্যাচুইটি, ভবিষ্যৎ তহবিল, আখের মূল্য ও সরবরাহকারীর বিল বাবদ বকেয়া ৫৫১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তবে সম্প্রতি কর্পোরেশন ৪০৭ টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছে। আরো ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, সরকারি হিসাবে প্রতি বছর দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। বিপরীতে সরকারি ১৫টি চিনিকলে উৎপাদিত হয় মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার টনের মতো। অর্থাৎ মোট চাহিদার ১০ শতাংশের কিছু বেশি চিনি সরকারি চিনিকলগুলোতে উৎপাদন করা হয়। বাকি চিনি বেসরকারি চিনিকল ও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বর্তমানে দেশে কর্মরত বেসরকারি চিনিকলের মধ্যে প্রায় সবগুলোই মুনাফা করছে। তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, নরসিংদীর পলাশে দেশবন্ধু সুগার মিলস, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ইউনাইটেড সুগার মিলস ও আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি, চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এস আলম রিফাইন্ড সুগার মিল। বিলুপ্ত প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, সুনির্দিষ্ট ৬টি কারণে সরকারি চিনিকলগুলো লোকসান দিচ্ছে। আর তা হচ্ছে- যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সরকারি কারখানাগুলোয় উৎপাদিত চিনির ব্যয় বেশি, কিন্তু তুলনায় বাজারে চিনির দাম কম। সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা অদক্ষতা, দুর্নীতি ও ব্যাপক অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরাও বলছেন বাজারে সরকারি চিনির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ করা হয় না।
সূত্র আরো জানায়, আখ উৎপাদনের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে আখ চাষিদের সরকারি মিলের মাধ্যমে যে ঋণ দেয়া হয়, কৃষকরা ওই ঋণের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করলেও মিল কর্তৃপক্ষ পুরো টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করে না। প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের শনাক্ত করা ৬ কারণের বাইরেও সরকারি চিনিকলগুলোয় লোকসান দেয়। তা হলো রাজনৈতিক প্রভাবে অধিক জনবল নিয়োগ। সিবিএ’র নামে দলাদলি। মিল পরিচালনায় সিবিএ নেতাদের হস্তক্ষেপ এবং সিবিএ নেতার পরিচয়ে অধিকসংখ্যক জনবল মিলের উৎপাদন কাজে যুক্ত না হওয়া। সরকারি মিলগুলোয় কাঁচামাল বা উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহন মিলের কর্মকর্তা বা সিবিএ নেতা কর্তৃক ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা, অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের বিল আদায়, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে কোনো বিপণন সিস্টেম না থাকা। সরকারি মিলগুলোর লোকসানের আরেকটি কারণ হলো পণ্যের প্রচার না থাকা। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের মতে, চিনিকলগুলোয় শুধু চিনি উৎপাদন করে লাভজনক করা যাবে না। চিনিকলের কর্মচারীদের বছরে মাত্র ৩ মাস কাজ থাকে। বাকি ৯ মাস তারা অলস সময় কাটায়। পরিস্থিতি উত্তরণে আখমাড়াই মৌসুম শেষ হলে চিনিকলগুলোয় অন্য পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে এবং অতিরিক্ত জনবল কমাতে হবে। লোকসানের কারণে সরকার সম্প্রতি ৬টি চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্ত ওই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছে ওসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ওসব মিলে আখ মাড়াই বন্ধ করা হয়েছে। উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া চিনিকলগুলো হচ্ছে- কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড়, শ্যামপুর (রংপুর), রংপুর ও সেতাবগঞ্জ (দিনাজপুর) চিনিকল। মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া ৬ চিনিকল গত অর্থবছরে ৩৮০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। তার মধ্যে কুষ্টিয়া চিনিকল ৬১ কোটি, পাবনা ৭৪, পঞ্চগড় ৪৭, শ্যামপুর ৫৯, রংপুর ৫৩ এবং সেতাবগঞ্জ চিনিকল লোকসান দিয়েছে ৮৪ কোটি টাকা। তবে লোকসানের দায় নিতে রাজি নয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি) কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সরকারি চিনিকলগুলোর অবস্থা প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদদের মতে, যে উদ্দেশ্যে সরকারি কোম্পানি গঠন করা হয়েছিল তা সফল হয়নি। কারণ প্রতিষ্ঠানের লোকসান বৃদ্ধির কারণে বাজার প্রতিযোগিতায় বেসরকারি কোম্পানির তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে ওসব প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ছে। অর্থাৎ মুদ্রা এবং পুঁজি উভয় বাজারে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট ভেঙে দেয়া উচিত। তা না হলে পরিস্থিতি উন্নতি হবে না। কারণ বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি চিনিকলগুলো উৎপাদন বন্ধ রেখে বাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হওয়ায় দিনের পর দিন মূলধন আটকে থাকছে। আর মূলধন আটকে গেলে বাড়তে থাকে ব্যাংক ঋণের সুদের পরিমাণও। তাছাড়া সরকারি চিনিকলগুলোয় ব্যবহৃত প্রধান কাঁচামাল আখ পাওয়া যায় না। আখের অভাবে চিনিকলগুলো মাসের পর মাস বন্ধ থাকে। আর চিনিকল বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে সারা বছরের বেতন-ভাতা দিতে হয়। উৎপাদন নেই কিন্তু বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। ফলে লোকসানের পরিমাণও বাড়ছে। তাছাড়া সরকারি চিনিকলগুলোতে সারা বছর উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে যথাসময়ে ব্যাংক ঋণও পরিশোধ করা যাচ্ছে না। আর যথাসময়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় প্রতিদিন ব্যাংকগুলোর কাছে চিনিকলগুলোর দায় বাড়তে থাকে। তাছাড়া আখ চাষে চাষীদের আগ্রহ কমে গেছে। মিলগুলোয় আখ সরবরাহ করতে সরকারি দলের আধিপত্য বিস্তার, সরকারি কর্মকর্তাদের নানারকমের ঝুটঝামেলা এবং কলগুলোয় সরবরাহকৃত আখের মূল্য সময়মতো না পাওয়ায় আখচাষীরা আখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। একই সাথে আখ সরবরাহে জটিলতা, আখের দাম না পাওয়ায় আখ চাষের বদলে চাষীরা অন্য ফসল চাষ করার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যে কারণে দিন দিন আখ চাষের জমি কমে যাচ্ছে। সেটিও চিনিকলগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে সার্বিক প্রসঙ্গে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা জানান, সরকারি চিনিকলগুলোর লোকসানের মূল কারণ বিক্রয় মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি। লোকসান কমানোর প্রথম ধাপ হিসেবে ৬টি চিনিকল বন্ধ করা হয়েছে। জাপান ও থাইল্যান্ড সরকারি চিনিকলে ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায়। তবে করোনার উত্তরণ হলে ওই বিনিয়োগ আসতে পারে।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:২৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০

ajkervabna.com |

advertisement
advertisement
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
advertisement

©- 2021 ajkervabna.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।