ajkervabna.com
শনিবার ২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মাদক মামলা: বয়স্ক মায়ের সেবা করার শর্তে এক আসামিকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮ নভেম্বর ২০২০ | ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ | 120 বার

মাদক মামলা: বয়স্ক মায়ের সেবা করার শর্তে এক আসামিকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট

অদ্য মাননীয় বিচারপতি জাফর আহমেদ-এর সমন্বয়ে গঠিত মহামান্য হাইকোর্টের একক বেঞ্চ একটি রিভিশন মামলার রায় প্রদান করে আসামিকে জেলে না পাঠিয়ে প্রবেশন প্রদান করেন। মাননীয় আদালতে আসামির পক্ষে শুনানী করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মো: রুহুল আমীন এবং এডভোকেট মোঃ আসাদ উদ্দিন।

রায় প্রদানের পর আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনে আসামি মতি মাতবরের ৫ বছরের সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিভিশন মামলার রায়ে আসামির সাজা বহাল রেখে প্রবেশন প্রদান করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রবেশন আইনে মাননীয় হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় রায়। আর বিশেষ আইনে এটি প্রথম রায়। যা অত্যন্ত আশাপ্রদ এবং যুগান্তকারী।

মামলার ঘটনায় প্রকাশ-
আসামি মতি মাতবর এবং অপর একজন আসামির নিকট ৪১১ পিস এবং ৭০০ পিছ ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বরে ঢাকার কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। পুলিশ আসামিদ্বয়কে বিজ্ঞ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। বিজ্ঞ আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২৪ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে চার্জশীট দাখিল করে। মামলাটি বিচারের জন্য বিজ্ঞ মহানগর দায়রা আদালত, ঢাকা- এ স্থানান্তরিত হয় এবং সেখানে দায়রা মামলা নং ৭২৩/২০১৬ হিসাবে রেজিস্ট্রি হয়। বিজ্ঞ দায়রা আদালত অপরাধ আমলে গ্রহণ করেন এবং বিচারের জন্য বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ, আদালত নং-৩, ঢাকা-এ প্রেরণ করেন। ২৯ মার্চ ২০১৬ তারিখে বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ, আদালত নং-৩, ঢাকা আসামিদ্বয়ের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ১৯(১) ও ১৯(৪) তৎসহ টেবিল ৯(খ) এর অধীন চার্জ গঠন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক উপস্থাপিত ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ০৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর হাকিম আদালত আসামিদ্বয়কে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করেন। উক্ত রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে আসামিদ্বয় বিজ্ঞ মহানগর দায়রা আদালতে ফৌজদারী আপীল নং- ১৭৯/২০১৭ দায়ের করেন। ১১ মে ২০১৭ তারিখে আপীল শুনানি অন্তে বিজ্ঞ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ, আদালত নং-৭, ঢাকা আপীলটি খারিজ করে দেন এবং বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। আপীলের রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে আসামী মতি মাতবর ১ জুলাই ২০১৭ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। আসামি ২৩ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে গ্রেফতারের পর দীর্ঘ ২০ মাস যাবত কারাভোগ করছিলেন। ০৯ জুলাই ২০১৭ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ তাকে জামিন প্রদান করেন।

পরবর্তীতে উক্ত রিভিশন মামলাটি পূর্ণাঙ্গ শুনানীর জন্য কার্যতালিকায় আসে। শুনানীর এক পর্যায়ে আইনজীবী শিশির মনির আদালতের কাছে নিবেদন করেন যে, এ মামলায় প্রবেশন অধ্যাদেশ, ১৯৬০ এর ধারা ৫ অনুযায়ী আদেশ দেয়া যেতে পারে। যেহেতু তার এটিই প্রথম অপরাধ এবং আর কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকার কোন রেকোর্ড নেই। তিনি আগামীতে কোন অপরাধ করবেন মর্মে ধারনা করার মত কোন তথ্য নেই। সে কারণে তিনি প্রবেশন আইনে সুযোগ পেতে পারেন।

যদিও আমাদের দেশে এই জুরিসপ্রুডেন্স খুব বেশি আগায়নি। সামান্য পরিমাণ সাজাতেও একজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। অথচ উন্নত বিশ্বে বড় সাজা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচার-আচরণ, গুণাবলি বিবেচনায় তাকে প্রবেশনে রাখা হয়। আসামি যেন নিজেকে শুধরে নিতে পারেন, সেই সুযোগটা তাকে দেয়া হয়।

মাননীয় আদালতে শিশির মনির আরো বলেন, সাজা বহাল রেখে আসামিকে প্রবেশনে দিলে তার সাজাতে কোনরুপ প্রভাব পড়বে না। বিশেষ আইনের অধীনেও আসামি প্রবেশন আইনের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। শুনানীকালে বিশেষ আইনে অন্যান্য দেশে প্রবেশন দেওয়ার অনেকগুলো নজির উপস্থাপন করা হয়।

মাননীয় আদালত সন্তুষ্ট হয়ে এ নিবেদন গ্রহণ করেন এবং ৭ অক্টোবর ২০২০ তারিখে অপরাধী সংশোধন ও পূণর্বাসন সমিতি, ঢাকা কে নির্দেশ দেন, ১০ দিনের মধ্যে অত্র আসামির নামে ব্যাংক একাউন্ট এবং টিন নাম্বার খুলে দিতে। এ আদেশের আলোকে পদক্ষেপ নিয়ে ২১ অক্টোবর ২০২০ তারিখে ঢাকা জেলার প্রবেশন অফিসার মাননীয় আদালতকে অবহিত করেন। অতপর মাননীয় আদালত এন্টিসিডেন্ট রিপোর্ট প্রদানের জন্য আরেকটি আদেশ প্রদান করেন। আদেশের আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ২ নভেম্বর ২০২০ তারিখ আদালতে এন্টিসিডেন্ট রিপোর্ট দাখিল করেন।

উক্ত রিপোর্টে আসামির স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করা হয়। ফলশ্রুতিতে মাননীয় আদালত সন্তুষ্ট হয়ে অদ্য ০৮ নভেম্বর রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।

রায়ে মাননীয় আদালত দেড় বছরের জন্য প্রবেশন মঞ্জুর করেছেন। আদালত কয়েকটি নির্দেশনা প্রদান করেন। আসামিকে তার পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখতে হবে। মায়ের সেবা করতে হবে। ছেলে মেয়ের লেখাপড়া ও দেখাশোনা নিশ্চিত করতে হবে। আইন অনুযায়ী বয়স না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের বিবাহ দিতে পারবে না।

বাংলাদেশের আইনের ইতিহাসে বিশেষ আইনে এটিই প্রথম রায়। বিচারপতি আসামি মতি মাতবরকে প্রবেশন প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করলেন।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২০

ajkervabna.com |

advertisement
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
advertisement
আর্কাইভ
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
advertisement

©- 2021 ajkervabna.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।